গ্রামেও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ পৌঁছে দিয়ে পল্লী গ্রামের ঐতিহ্য বিশেষ করে তাঁত অ্যামাজনের মতো মার্কেট প্লেসের মাধ্যমে বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য একটি টেকসই ইকো সিস্টেম গড়ে তুলতে চায় ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ। এজন্য ইউনিয়ন পর্যায়ের ডাকঘরগুলোকে প্রযুক্তি নির্ভর সেবা দেয়ার সক্ষমতা অর্জন করার পাশাপাশি গ্রামে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিটিসিএল এর ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। সে লক্ষ্যে ফ্রিল্যান্সারদের সহযোগিতায় টাঙ্গাইলের মধুপুর বনাঞ্চলের মতো মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় অবস্থিত দরগ্রামে অবস্থিত দেশের প্রথম ডিজিটাল পল্লীতেও বিটিসিএল এর ব্রডব্যান্ড সেবা পৌঁছে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। একইসঙ্গে এই সংযোগে যেনো তাঁত পল্লীর সকলেই সংযুক্ত থাকতে পারেন সে জন্য ওয়াইফাই হটস্পটও উপহার দিতে চেয়েছেন মন্ত্রী।
তিনি বলেছেন, বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন প্রযুক্তির শক্তিতে স্মার্ট বাংলাদেশের পথে যাত্রা শুরু করেছে। সেই যাত্রায় কেউ পিছিয়ে থাকবে না। উচ্চগতির ইন্টারনেটের মহাসড়ক ধরেই গ্রামের তাঁতি, কুমার, কৃষক সবাই ই-কমার্স এ অন্তর্ভূক্তির মাধ্যমে আমাদের ঐতিহ্যকে বিশ্বে ছড়িয়ে দেবে। সে জন্য আমরা আমাদের ডাকসেবাকে ডিজিটাল রূপান্তর করছি। মধুপুরের গড়ে যেমন বিটিসিএল এর মাধ্যমে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ করে দিয়েছি তেমনি সাটুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ১৩ কিলোমিটার ক্যাবল টেনে হলেও এখানে ব্রডব্যান্ড সেবা দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে। তাঁতিদের শৈল্পিক সত্ত্বার বিকাশের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। ই-কমার্স ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড সেবা সবত্র পৌঁছে দেয়া হবে। আমরা বঙ্গবন্ধুর সোনার মাটি ও সোনার মানুষকে মানবসম্পদে রূপান্তর করে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত করবো। এখানে কেউ পিছিয়ে থাকবে না। সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হবে।
সাটুরিয়ার নির্মাণাধীন দরগ্রাম পোস্ট অফিস এবং ডিজিটাল পল্লী পরিদর্শন কালে এসব আশ্বাসের কথা শোনান মন্ত্রী। এসময় ই-ক্যাব সাধারণ সম্পাদ আব্দুল ওয়াহেদ তমাল, বিজয় ডিজিটাল লিমিটেডের সিইও জেসমিন জুঁই, মন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব সেবাস্টিন রেমা, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সানোয়ারুল হক, ইউ,এন,ও শারমিন আরা, ডিজিটাল পল্লী প্রকল্পের উপদেষ্টা ইব্রাহিম খলিল, পরামর্শক মীর শাহেদ আলী, জাহিদুজ্জামান সাঈদ, জুনায়েদ আহমেদ, মোহাম্মাদ নাজমুল হাসান ও ফজুল্লাহ হাসান এবং বিটিসিএল প্রকল্প পরিচালকসহ উপজেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রায় ৪ ঘণ্টার পরিদর্শনে স্থানীয় ব্যক্তিদের সুখ-দুঃখের কথা শুনে তাদেরকে সরকারের পক্ষ থেকে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের ভাগ্যন্নয়নে নেয়া নানা পদক্ষেপের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফ জব্বার বলেন, বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামই একদিন ডিজিটাল হবে। ডিজিটাল বাংলাদেশ যেমন একদিন অবিশ্বাস্য ছিল তা আজ বাস্তবায়ন হয়েছে। তেমনি বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রাম একদিন ডিজিটাল পল্লী হবে এবং ঘরে ঘরে গড়ে উঠব ডিজিটাল উদ্যোক্তা। এজন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মৃতপ্রায় ডাকঘরকে পূণর্জীবন দান করার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া, ডিজিটাল কোরবানি হাটে পশু বিক্রি করার উদ্যোগ নেয়া, আম মেলা ইত্যাদি নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ই-ক্যাব এসব ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখেছে। আমি আশা করবো যেখানেই যে সমস্যা বা প্রতিবন্ধকতা থাকনা কেনো আমাকে লিখিত ভাবে প্রকল্প আকারে তা জমা দিলে আমি এর সমাধান করবো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশে কোনো কিছুই আটকে থাকে না।

এর আগে পড়ন্ত দুপুরে সাটুরিয়া ডাকবাংলোতে পৌঁছলে মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাজব্বারকে গার্ড অব অনার দেয় স্থানীয় প্রশাসন। এরপরবাংলাদেশের ১৯ শতকে নির্মিত রেনেসা যুগে নির্মিত স্থাপত্যকৌশলের সাহায্যে নির্মিত অন্যতম নিদর্শন। এই বিশাল প্রাসাদটি ২০ একরের চেয়ে বেশি স্থান জুড়ে বিস্তৃত বালিয়াটি প্রাসাদে কিছুক্ষণ সময় কাটান তিনি। সন্ধ্যা নাগাদ ডিজিটাল পল্লী দর্শনে দরগ্রাম স্কুলের সামনে পৌঁছতেই শিশুরা ছুটে আসেন বিজয় বাংলা ও ডিজিটাল বর্ণমালার রূপকার মোস্তাফা জব্বারের কাছে। কেউ কেউ ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান এবং সেলফি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পরেন। এর পরে আড়াই শতাধিক তাঁতীর এই ডিজিটাল পল্লীতে তাঁতিদের সঙ্গে কথা বলেন মন্ত্রী। সেখানে উপস্থিত তাঁতীরা মন্ত্রীরকে জানান, ডিজিটাল পল্লী থেকে তারা প্রশিক্ষণ নিয়ে করোনার সময়ে তারা ইন্টারনেটে তাদের তৈরি পোশাক বিক্রি করে সংসার চালাতে পেরেছেন। কিন্তু মোবাইল ইন্টারনেটই তাদের একমাত্র ভরসা হওয়ায় অনলাইনে তারা খুব একটা সুবিধা করতে পারছে না। তাই উচ্চগতির ইন্টারনেটের ব্যবস্থা করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তারা।

এসময় মন্ত্রীর ইতিবাচক সাড়া পেয়ে ডিজিটাল পল্লী উদ্যোগকে আরো সম্প্রসারণ করে ডিজিটাল পল্লী’র চাষী থেকে শুরু কারুশিল্পী এমনকি ঘরের রান্না খাবারও যেনো অনলাইনে বিক্রি করা সম্ভব হয় সেজন্য একটি ইকো সিস্টেম গড়ে তুলতে বেশ কিছু প্রস্তাব তুলে ধরেন ই-ক্যাব সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওয়াহেদ তমাল। তিনি বলেন, আমরা এমন একটা ডিজিটাল ইকো সিস্টেম গড়ে তুলতে চাই যার মাধ্যমে এই গ্রামে বসেই কৃষক বা প্রান্তিক খামারি ও কারু শিল্পীরা অ্যামাজনে তাদের পণ্য বিক্রি করতে পারে। মন্ত্রী এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে এ বিষয়ে একটি প্রকল্প জমা দেয়ার পরামর্শ দেন। এভাবেই একে একে দেশের প্রতিটি গ্রামই ডিজিটাল পল্লীতে রূপান্তরিত হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
“গ্রাম থেকে বিশ্বে" এই প্রতিপাদ্যে ২০১৯ সালে
মানিকগঞ্জ জেলার সাটুরিয়া উপজেলার বরাইদ ইউনিয়নের চারটি গ্রাম নিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রথম ডিজিটাল পল্লী যাত্রা শুরু করে।